৩০, নভেম্বর, ২০২০, সোমবার

ট্রাম্পের কারণেই বিশ্ব নেতৃত্বে গুরুত্ব হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন পৃথিবীর দুয়ার খুলে দেয়। যে পথ ধরেই গত সাত দশক পৃথিবীরনেতৃত্ব দিয়েছে দেশটি। ৯০ দশকে সোভিয়েত শাসনের অবসান হলে তাদের আধিপত্য একচ্ছত্র হয়ে ওঠে। পৃথিবীর সবখানে নিজের সরব উপস্থিতি বজায় রাখে দেশটি।

বিশ্ব পরিচালনার এ মোড়লগিরিতে নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইনকে অসংখ্যবার অবজ্ঞা করা হয়। ঠিক-বেঠিক নির্ধারণে বিশ্ব বিবেক হয়ে ওঠার দাবী করে আমেরিকা। আর স্ব-আরোপিত নীতি পুলিশের কাজও রাষ্ট্রটি করতে থাকে।

এতকিছুর পরও সাত দশক একচ্ছত্র শাসন; যা অনেক লম্বা সময়। দীর্ঘ সময়টিতে অনিয়ম করেও যুক্তরাষ্ট্র যে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে, সেটাই বরং আশ্চর্যের। তবে সেই বিস্ময়ের অবসান হয়েছে। আর সে কৃতিত্বটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের!

শুরু থেকেই ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সহযোগীতার প্রথায় আঘাত হানে। মিত্রদের সঙ্গে ব্যবসায়ীক স্বার্থ নিয়ে ট্রাম্প এমন দর কষাকষি সূত্রপাত করেন, যা তার আগে অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধান করেননি। ঐতিহ্যগত মিত্র; কানাডা ও জাপান কেউই বাদ পড়েনি।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ভারতের সঙ্গেও বাণিজ্য নিয়ে চাপ প্রয়োগ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। তিনি একের পর এক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সমালোচনা ও পরবর্তীতে সেগুলো বাতিল করেছেন। পূর্বসূরীদের তৈরি অনেক সংস্থার ভূমিকা অগ্রাহ্য করেছেন। উজ্জ্বল উদাহরণ; বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। অথচ, মুক্ত বাণিজ্যভিত্তিক বাজার ব্যবস্থার প্রবক্তাই ছিল যুক্তরাষ্ট্র।

তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরি সম্পর্ক- এমন কিছু দেশের একনায়কদের সঙ্গে সখ্যতা গড়েন ট্রাম্প। আস্কারা পেয়ে এসব স্বৈরশাসকদের অধিকাংশেই নিজ স্বার্থ রক্ষায় আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। প্রেরণা পায় নিজ দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার দমনে আরও কঠোর হয়ে উঠতে।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেও, আন্তর্জাতিক আইন এবং মার্কিন মিত্রদের মূল্যবোধ কিন্তু ভেঙ্গে পড়েনি। একথা ঠিক একনায়কেরা আরও বেশি সাহসী হয়ে উঠেছে, কিন্তু, আন্তর্জাতিক আইনকে তারা একচেটিয়াভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব না থাকা সত্ত্বেও, চীনের বাহুডোরে বাধা পড়েনি দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্ররা। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ট্রাম্পের কারণে এমনটি হওয়ার তীব্র আশঙ্কা করেছিলেন। যদিও পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। সেই অনুসারে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতেও দেখা যাচ্ছে পরিবর্তন। আর চীনকে বন্ধু বা শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেই, তার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃমূল্যায়ন শুরু করেছে অনেক দেশ।

যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই বিশ্বের এই যে এগিয়ে যাওয়া, তা কিন্তু অপ্রত্যাশিত নয়। অনেকদিন থেকেই এমন সময়ের অনুমান করা হচ্ছিল। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল কূশীলবরা এখনই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব শেষ হয়ে গেছে, কথাটি মানতে নারাজ। আমেরিকার স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ আরও অনির্দিষ্টকাল থাকবে, এমন অভিমত তাদের।

তবে এ বিশ্বাসের বিরোধিতা করেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একচ্ছত্র বিশ্ব ব্যবস্থার এই মডেল অবশ্যই একদিন অবসান হবে এবং অন্যান্য শক্তির উত্থান হবে; যারা এই ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসীবাদের বিরুদ্ধে রক্ষাকর্তার ভূমিকা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের।

তারপর স্নায়ুযুদ্ধের বিজয় আমেরিকার আধিপত্যকে বাধামুক্ত করে তোলে। বিশেষজ্ঞরা একমেরু কেন্দ্রিক ব্যবস্থা বলেন এসময়কে, যা স্থায়ী হয় আরও ৩০ বছর। মার্কিনীরা যতোই অস্বীকার করুন, গত দুই দশক ধরেই অন্যদেশ যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিতে ইচ্ছুক, এমন অনেক আলামত দেখা যায়। শুধু ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা নয়, মিত্র দেশগুলোও এমন আকঙ্খা দেখিয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়; জার্মানির কথা। ইউরোপের অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্র বলেই পরিচিত দেশটি। ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র যখন ওবামা আমলের স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা সীমিত করতে ব্যস্ত, ঠিক তখন এবং মহামারির আগেই জি-২০ জোটের বৈঠকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবাকে সভার মূল এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মেরকেল।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ট্রাম্প বিরোধী বলেই পরিচিত মেরকেল। গত মে’তে তিনি জানান, মহামারি মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন বৈশ্বিক দায়ভার গ্রহণ করুক, এটাই তার ইচ্ছা। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার রক্ষাতেও জোটটির নেতৃত্ব দেওয়া উচিৎ বলে তিনি মন্তব্য করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও সহযোগীতা রক্ষা করা দিনে দিনে কঠিন হয়ে পড়ছে, বলে এসময় তিনি উল্লেখ করেছিলেন।

আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের ফলাফল যদি পক্ষে না যায়, তাহলে হয়তো ট্রাম্পকেও একদিন মার্কিন আধিপত্য হ্রাসে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। খবর সিএনএন।

সর্বশেষ নিউজ