২৮, নভেম্বর, ২০২০, শনিবার

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন: কী চাইছে চীন, রাশিয়া, ইসরায়েল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সবসময়ই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগের কেন্দ্রে অবস্থান করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এনেছেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার জয়ের মধ্য দিয়ে সে ধারা বজায় থাকবে নাকি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন এসে নতুন নীতি নির্ধারণ করবেন তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কারণেই চীন, রাশিয়া আর ইসরায়েল এই নির্বাচনের দিকে বিশেষ নজর রাখছে।

নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময়জুড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন ভোটারদের সামনে প্রমাণের চেষ্টা করে গেছেন−চীনের ব্যাপারে কে কার চেয়ে বেশি শক্ত হবেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কোনও সন্দেহ নেই যে ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে তাদের দু’জনের যিনিই জিতুন না কেন, আমেরিকা এবং চীনের সম্পর্কে যে ভাঙন শুরু হয়েছে−তা থামবে না।

চীনের মতো করে আর অন্য কোনও দেশই এতোটা ক্ষোভ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে দেখে না। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও করোনাভাইরাস ইস্যুতে তিক্ততা চরমে পৌঁছেছে। ১৯৭৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে ওয়াশিংটনের প্রথম স্বীকৃতির পর এটিই সর্বোচ্চ মাত্রার তিক্ততা। তবে তারপরও চীনা কর্মকর্তারা নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ে অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার আশা করছেন না বললেই চলে। বরং তারা মনে করেন, বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে ‘চীনের প্রতি আরও বেশি কঠোর’ হবেন। তিনি আরও জটিল হবেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ অনলাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি ক্যাম্পেইনকে দুই বৃদ্ধের মধ্যকার লজ্জাজনক লড়াই হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। কাইজিং নামের এক ম্যাগাজিনে লেখা হয়েছে−‘আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিতর্ক কেন কাঁচা বাজারের ঝগড়ার মতো মনে হয়?’

গত সপ্তাহে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে আক্রমণ করে বলেন, ‘সমসাময়িক বিশ্বে কোনও ধরনের একতরফাবাদ, সংরক্ষণবাদ ও চরম ইগো কখনও কাজ করে না।’

রাশিয়া

২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে বিজয়ী করতে প্রচেষ্টা চালানোর জন্য রাশিয়াকে অভিযুক্ত করে থাকে সিআইএ। এবারও মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে প্রার্থীই জয়ী হোন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে ভুয়া তথ্য ব্যবহার অব্যাহত রাখবে রাশিয়া। আর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে মস্কোর প্রচেষ্টা আরও বেশি জোরালো হবে বলেও হুঁশিয়ার করেছেন তারা। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার মর্যাদাহানির চেষ্টা করতে পারে রাশিয়া। মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের প্রচার শিবিরকে অবমূল্যায়নের চেষ্টা করছে মস্কো। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ এ খবর জানিয়েছে।

এদিকে ক্রেমলিনপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো এবারের নির্বাচনে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা জানাচ্ছে। রাশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড কমসোমলস্কায়া প্রাভদা এর শিরোনামে বলা হয়, ‘আমেরিকা কি গৃহযুদ্ধ থেকে এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে আছে?’

তবে বেশিরভাগ রুশ নাগরিক মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কে জয়ী হলো তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। আরসেন পি আরুতইয়ুনিয়ান নামের ২৫ বছর বয়সী এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ‘ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তবে তাতে কোনও কাজ হয়নি। পুতিনকেই রাশিয়ার জন্য ভালো প্রেসিডেন্ট হতে দিন।’

ইসরায়েল

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন হোয়াইট হাউস থেকে বিপুল রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে ইসরায়েলের ডানপন্থী সরকার। তার ‍বদৌলতেই তিনটি আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিতে পৌঁছাতে পেরেছে তারা। ট্রাম্প জয় না পেয়ে যদি সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ বাইডেন জুনিয়র জয় পান, তবে তা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য যথেষ্ট ক্ষতির কারণ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত সাল্লাই মেরিডোর বলেন, ‘ট্রাম্প শাসনক্ষমতায় থাকলে হোয়াইট হাউস ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার সম্পর্ক আরও বেশি আলোক ঝলমলে হবে।’

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। লেবাননের সংবাদপত্র আন্নাহার আল আরাবির কলাম লেখক হিশাম মেলহেম বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিকরা জয়ী হলে মিসর, সৌদি আরব এবং তুরস্কের স্বৈরশাসকদের জন্য ওয়াশিংটনে কোনও বন্ধু থাকবে না বললেই চলে।

হিশাম আরও বলেন, বাইডেনের বিজয় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে সৌদি আরবকে ভাবনায় ফেলতে পারে। কারণ সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে দেখে থাকেন বাইডেন। তার জয়ের পর সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে রিয়াদকে।

আবার ট্রাম্পের বিজয় ইসরায়েলিদেরকেও পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পারবে তা নয়। সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত মেরিডোর বলেন, ট্রাম্প যে ইসরায়েলের জন্য ভালো সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। তবে গত চার বছরে বিশ্বে আমেরিকার নেতৃত্ব হ্রাস পাওয়ার ব্যাপারে যে ইসরায়েলিরা জানে না তা নয়। ইসরায়েলের জন্য বড় চিন্তার জায়গা হলো আমেরিকাকে শক্তিশালী হতে হবে। চীনের জ্বালানি চাহিদা ও রাশিয়ার তেলের মূল্য সংক্রান্ত স্পর্শকাতরতার প্রসঙ্গ টেনে মেরিডো বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান উপস্থিতি ও প্রভাব তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য চ্যালেঞ্জ ও দর কষাকষির পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। আমি চাই না আমার নাতি-নাতনিরা চীন ও রাশিয়ার আধিপত্যের অধীনে চলা বিশ্বে বড় হোক।’

সর্বশেষ নিউজ