২৮, নভেম্বর, ২০২০, শনিবার

সিরাজদিখানে চিকিৎসা সেবায় ডাঃ বদিউজ্জামানের দৃষ্টান্ত স্থাপন

মোঃ আমির হোসেন ঢালি, সিরাজদিখান (মুন্সিগঞ্জ) প্রতিনিধি:

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. বদিউজ্জামানের
দু’বছরে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও চিকিৎসাসেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন । এ কর্মকতা ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মর্কতা হিসেবে যোগদান করেন।
যোগদান করেই হাসপাতালে কর্মরত সহকর্মীদের সাথে গড়ে তুলেন সুসম্পর্ক। তাদেরকে সন্তানের মতো শাসন এবং ভালোবাসা দিয়ে দক্ষতার সাথে প্রশাসনিক কাজ করে গেছেন।

তিনি দুবছরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ব্যাপক সুনাম অর্জন করে উপজেলা বাসীর কাছে প্রশংসা অর্জন করেন ।
তিনি মনে করেন সৎ-সাহস ও সদিচ্ছা থাকলে একদিন কঠিন কাজেও সফলতা অর্জন করা সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে তার কর্মকান্ডে এমন প্রমাণ মিলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রতিনিয়তই উনার কর্মকান্ড সাধারণ মানুষসহ সচেতন মানুষদের নজরে এসেছে।

প্রথম কর্মদিবস থেকেই শুরু করেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উন্নয়ন যা অতীতের সকল কর্মকর্তাকে ছাড়িয়েছে । নিজের বসার অফিস এবং হাসপাতালের অনেক কিছু নিজস্ব অর্থায়নে সাজিয়ে গুছিয়ে নেন এ কর্মকর্তা। এক কথায় নিজের মতো করে ঢেলে সাজান পুরো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে । তার সততা ও কর্মদক্ষতায় ক্রমান্বয়ে বদলে যায় পুরো হাসপাতালের পরিবেশ। কর্মরত সকলের কাজে আসে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা। কমে যায় ভোগান্তি আর বৃদ্ধি পায় সেবার মান।

যোগদানের কিছুদিন পর হাসপাতালের পরিত্যক্ত জায়গায় সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নিজস্ব অর্থায়নে এবং হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স,কর্মকর্তা, টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও কৃষি কর্মকর্তাদের আর্থিক সহযোগিতায় গড়ে তোলেন পরিপাটি একটি ফুলের বাগান। যা হাসপাতালের বাহ্যিক সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দেয়।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রান্তিক এলাকার চিকিৎসার অন্যতম ভরসা কমিউনিটি ক্লিনিক। তার উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবার মান বাড়াতে প্রতিটা কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করেছেন বহুবার যা প্রান্তিক রোগীরা উপকৃত হয়েছেন চিকিৎসা নিতে পেরেছেন স্বাচ্ছন্দে । কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের মাসিক সমন্বয় সভা অব্যহত রেখেছেন তিনি। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যাথলজিক্যাল বিভাগ, ল্যাব পরিদর্শন করেন এবং সেসব হাসপাতালে কর্মরত টেকনোলজিস্ট, ডাক্তার, নার্সদের সাথে মতবিনিময় করে সু-পরামর্শ দিয়েছেন।

জানা যায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর শুরুতে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে হাসপাতাল আঙ্গিনার আনাচে-কানাচে ফলজ ও বনজ গাছের চারা রোপণ করেন।
“মুজিব বর্ষে স্বাস্থ্য খাত এগিয়ে যাবে অনেক ধাপ”এই স্লোগানে তিনি নিজের অর্থায়নে হাসপাতাল প্রশাসন ভবন মুখেই বঙ্গবন্ধুর ছবি সম্বলিত একটি বিলবোর্ড স্থাপন করেন।

তিনি নিজ উদ্যোগে বৈশ্বিক মহামারী করোনা কালে উপজেলাবাসীকে করোনা সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষার জন্য সরকারের দেয়া বিধি-নিষেধ ও সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করেন।
সিরাজদিখানের প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগীর আইসোলেশন এর ব্যবস্থা করা হয় তার পরামর্শে এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
কোভিড ১৯ মহামারির সময়ে সিরাজদিখানের
বেসরকারি হাসপাতাল চেম্বারগুলো যখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল তখন একমাত্র চিকিৎসা সেবার ভরসার জায়গা হয়েছিলো এই সরকারি হাসপাতাল।
সে সময় চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মরত অনেক ডাক্তার, নার্স , কর্মকর্তা , টেকনোলজিস্ট এবং অ্যাম্বুলেন্স চালকসহ করোনায় আক্রান্ত হয় এই প্রতিষ্ঠানের অনেকেই।
সিরাজদিখান উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দুইটি উপজেলা শ্রীনগর-লৌহজংয়ের রোগীরাও ছুটে আসেন এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা নিতে। এজন্য জরুরী বিভাগ, বহিঃ বিভাগ,আন্তঃবিভাগ খোলা রেখে চালিয়ে গেছেন চিকিৎসাসেবা। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেয়া হয়েছে করোনা আক্রান্তদের আইসোলেশন সুবিধা। তার প্রতিষ্ঠানের এতগুলো লোক করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরেও থামিয়ে রাখেননি স্বাভাবিক চিকিৎসা সেবা।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা সেবার মান বাড়াতে সেবা নিতে আসা রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত এর জন্য ও তাদের স্বজনদের মোটরসাইকেল, বাইসাইকেলের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ হাসপাতালের স্টাফদের কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য,
স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কক্ষ , আউটডোর ইনডোর সহ বিভিন্ন স্থানে ১২টি নিরাপত্তা ক্যামেরা স্থাপন করেন।

গত সোমবার ২ নভেম্বর,২০২০ সরেজমিনে সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মুখ থেকে শোনা যায় তার প্রশংসা এবং সুনাম এর কথা।

আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তাইফুল হক বলেন,স্যার ছিলেন আমাদের কাছে বট বৃক্ষের মত, আমরা সেই বৃক্ষের ছায়া তলে ছিলাম। স্যার চলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে আমাদের উপর থেকে সে ছায়াটা সরে যাচ্ছে। স্যারের সহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে, আমি কাছ থেকে দেখেছি কতটা মানবিক এবং ভালো একজন কর্মকর্তা তিনি। হাসপাতালের এমন কোন জায়গা নেই, যেখানে তার উন্নয়নের হাতের ছোঁয়া লাগেনি। আমাদের মসজিদের এসি থেকে শুরু করে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বসার জন্য যে মোড়া এবং বাথরুমে যাওয়ার জন্য যে স্যান্ডেলটি সেটিও তিনি নিজের অর্থ দিয়ে কিনে দিয়েছেন। সত্যি আমরা একজন ভালো মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে ছিলাম।

মেডিকেল অফিসার শিহাব আল মশিউর রহমান বলেন, শ্রদ্ধেয় বদিউজ্জামান স্যার অত্যন্ত দক্ষ একজন প্রশাসক ছিলেন। সে সাথে সৎ নিষ্ঠাবান ভদ্র মানুষ ছিলেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উন্নতির জন্য দুটি বছর এখানে কাটিয়ে গেলেন। তার জন্য দোয়া করি।

ডেন্টাল সার্জন মো. ইব্রাহিম হোসাইন বলেন, তিনি ভাল একজন আন্তরিক মানুষ ছিলেন।
আমাদের মত ডাক্তার-নার্সদের এবং সকলকে সকল বিষয়ে সুযোগ-সুবিধা দিতেন। সকল ক্ষেত্রে ভালো পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ইপিআই মোঃ আলমগীর গাজী বলেন, বদিউজ্জামান স্যার আমাদের মাঝে আশীর্বাদস্বরূপ কর্মকর্তা হিসেবে এসেছিলেন। তার যোগদানের পর ডাক্তার, নার্স কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। তার দক্ষতায় হাসপাতালে রূপ পাল্টে যায় পরিবর্তন আসে সকল ক্ষেত্রে ।

পরিসংখ্যানবীদ মো. মিজানুর রহমান খান বলেন, আমার চাকুরির বয়স ১৬ বছর অনেক উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেছি। প্রশাসনিক কর্মকর্তার হিসেবে বদিউজ্জামান স্যারের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি । তার জন্য সব সময় দোয়া করি আল্লাহ তাকে ভালো রাখেন।

সিনিয়র স্টাফ নার্স মোসাম্মৎ হাবিবুনন্নেছা বলেন,
স্যারের সাথে কাজ করেছি। তিনি আমাদেরকে ভালোবাসতেন যেকোনো কাজের সঠিক দিক নির্দেশনা দিতেন। কোন ভুল হলে সেটা তিনি বুঝিয়ে বলতেন।

সিনিয়র স্টাফ নার্স ওটি ইনচার্জ সোনিয়া খানম বলেন, স্যার সর্বসময় আমাদের খোঁজখবর রাখতেন। তিনি আমাদের সন্তানের মতো আদর স্নেহ করতেন। হাসপাতালে অভিভাবক হিসেবে যোগ্য একজন কর্মকর্তা ছিলেন। সব সময় স্যারের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

সিনিয়র স্টাফ নার্স ওয়ার্ড ইনচার্জ আফসানা আক্তার বলেন, স্যার একজন ভালো মানুষ ছিলেন।
আমাদের কেয়ার করতেন, আমরা কেমন আছি আমাদের রোগী গুলো কেমন আছে। সকল কাজের খোঁজ খবর তিনি নিতেন। কোন কাজে স্যারের কাছে গেলে মেয়ের মত বুঝিয়ে বলতেন। এমন স্যার আমরা আর পাব কিনা জানিনা।

ডাক্তার মো.বদিউজ্জামান সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে সর্বশেষ অফিস করেন ২ নভেম্বর সোমবার পর্যন্ত। এরপর তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করবেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে।

সর্বশেষ নিউজ