৩০, নভেম্বর, ২০২০, সোমবার

চাহিদার তুলনায় অর্থের জোগান কখনোই আসেনি

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাড়ে আট লাখ রোহিঙ্গা। এর পর থেকেই বাংলাদেশের নেতৃত্বে অন্য দেশ, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা নির্যাতিত বিশাল এই জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণ করে আসছে। এ জন্য প্রতিবছর তৈরি করা হয় জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি)। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যে অর্থায়নের চাহিদা প্রতিবছর দেয়া হচ্ছে, তার বেশির ভাগই পাওয়া যাচ্ছে না।

রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার জন্য বাংলাদেশের গত তিন বছরে অর্থের চাহিদা ছিল ২৩০ কোটি ডলার। কিন্তু দাতারা দিয়েছে ১৬০ কোটি ডলার, যা মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চাহিদার ৪৫ শতাংশ অর্থ জোগাড় করতে পেরেছে জাতিসংঘ। ফলে রোহিঙ্গাদের পেছনে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। ভাসানচরে আবাসন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে বাড়তি ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে দাতাদের মাধ্যমে যেসব অর্থ আসছে, তার ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা এবং তাদের সহযোগী এনজিওদের পরিচালন ব্যয় মেটাতে। বাকি অর্থ ব্যয় হচ্ছে মূল কর্মসূচি বাস্তবায়নে।

রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এ পর্যন্ত জাতিসংঘের সাতটি সংস্থা বাংলাদেশকে তহবিল দিয়েছে। এগুলো হলো জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআর, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ডব্লিউএফপি, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল ইউএনএফপিএ, জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও এবং নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন ওম্যান।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের জন্য মোট তহবিলের প্রয়োজন ছিল ৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। প্রতি ডলার ৮৬ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ৩ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। কিন্তু এই সাত সংস্থা মিলে দিয়েছে ৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলার; যা মোট চাহিদার ৭৩ শতাংশ। বাকি ২৭ শতাংশ বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করতে হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার চাহিদার বিপরীতে দাতাদের কাছ থেকে এসেছে ৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার; যা মোট চাহিদার ৬৯ শতাংশ।

২০১৯ সালে ৯২১ মিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রত্যাশিত হলেও পাওয়া গেছে ৬৩৫ মিলিয়ন ডলার; যা চাহিদার মাত্র ৬৯ শতাংশ। এই অর্থের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্যসামগ্রী কিনতে। তাদের জন্য চাহিদার ৭৫ শতাংশ খাদ্য, ৬৬ শতাংশ শিক্ষা, ৩৬ শতাংশ স্বাস্থ্য ও পুষ্টির মাত্র ৩৫ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পরিকল্পিত অনেক ব্যয় সংকোচন করতে হয়েছে। স্থানীয়দের জীবনমান উন্নয়নে নেয়া অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

চলতি বছর রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জন্য ১০০ কোটি ৬ লাখ ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও এর মধ্যে মাত্র ৪৭ কোটি ৭৫ লাখ ডলার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে বছরের প্রথম আট মাসে। প্রাক্কলন অনুযায়ী, আরো প্রায় ৫৮ কোটি ডলারের চাহিদা রয়েছে। অর্থাৎ সহায়তার হার ক্রমেই কমে আসছে। অনুদানের এসব অর্থ ৬১টি জাতীয় এনজিও, ৪৮টি আন্তর্জাতিক এনজিও ও ৮টি জাতিসংঘ সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যয় করা হচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আওতায় দুই থেকে তিন সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের জন্য প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল, ৯ কেজি ডাল ও ৩ লিটার ভোজ্যতেল দেয়া হচ্ছে। চার থেকে সাত সদস্যের পরিবারের জন্য জনপ্রতি মাসে ৬০ কেজি চাল, ১৮ কেজি ডাল ও ৬ লিটার ভোজ্যতেল এবং ৮-এর অধিক সদস্যের পরিবারের জন্য প্রতি মাসে ১২০ কেজি চাল, ২৭ কেজি ডাল এবং ১২ লিটার ভোজ্যতেল সরবরাহ করা হচ্ছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি প্রতি মাসে দুই রাউন্ডে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে। এর বাইরেও ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য বিভিন্ন শিশুখাদ্য সরবরাহ করা হয়। দেয়া হয় প্রয়োজনীয় ওষুধ। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন এর যাবতীয় ব্যবস্থাপনা করে।

তহবিলের ৩৩ শতাংশ ব্যয় সংস্থাগুলোর প্রশাসনিক ও পরিচালন খাতে
রোহিঙ্গাদের সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশই ব্যয় হয়েছে সংস্থাগুলোর প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয়ে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন ওম্যান। সংস্থাটি মোট তহবিলের ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যয় করেছে পরিচালন খাতে। বাকি ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় করেছে মূল কর্মসূচিতে।

এ ছাড়া ইউএনএইচসিআরের পরিচালন ব্যয় ২৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ইউএনএফপিএ ১৮, ডব্লিউএইচও ১৭, আইওএম ১৪ দশমিক ৭, ডব্লিউএফপি ১০ দশমিক ৩ এবং ইউনিসেফ ৩ শতাংশ পরিচালন খাতে ব্যয় করেছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম পরিচালন ব্যয় ইউনিসেফের।

বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব ব্যয় বাড়ছে
এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে সহায়তা এভাবে কমতে থাকায় সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যয় বেড়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এদিকে ভাসানচরে আবাসন প্রকল্পে সরকারের ব্যয় হয়েছে বাড়তি ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সূত্র জানায়, চলতি বছর রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। কিন্তু কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে এই প্রাক্কলনের ৬০ শতাংশ অর্জিত হবে কি না, তা নিয়েই বড় সন্দেহ রয়েছে।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ‘সারাক্ষণ’কে বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী প্রবেশের পর থেকে প্রতিবছরই জেআরপি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তাদের মানবিক সহায়তা দেয়ার জন্য অর্থায়নের যে প্রাক্কলন করা হচ্ছে, তা জোগাড় করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কারণ চাহিদা অনুযায়ী অর্থের জোগান কোনোবারই আসেনি। যদিও এবার কোভিড-১৯ এবং বর্ষার কারণে অতিরিক্ত বাজেট লাগছে।

অনুদানের অনেক অর্থ অযাচিতভাবে খরচ হচ্ছে মন্তব্য করে ওই কর্মকর্তা বলেন, অর্থায়ন যেহেতু মানবিক সহায়তার জন্য নেয়া হচ্ছে, তাই সিংহভাগ অর্থ মানবিক সহায়তায় খরচ হওয়া জরুরি। রোহিঙ্গা সংকটটি একা বাংলাদেশের নয়। তাই এর মোকাবিলা একা বাংলাদেশ করবে না। সব দেশকে সঙ্গে নিয়ে এর একটি টেকসই সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ।

তিন বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি
গত ২২ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর যৌথভাবে ভার্চ্যুয়াল এক সম্মেলনের আয়োজন করে। ইউএনএইচসিআরের হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রাথমিক দায়িত্বটা মিয়ানমারের। এ জন্য কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।

ওই সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ব্যাপক চেষ্টা সত্ত্বেও তিন বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। প্রত্যাবাসন না হওয়ার কারণে রোহিঙ্গারাও হতাশ। তারা তাদের জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের ৭৫তম অধিবেশনে দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সমস্যাটি মিয়ানমার তৈরি করেছে এবং এর সমাধান তাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ নেই
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় রেখে আরো বেশি সহায়তা দেওয়া যায় কি না, সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন ‘সারাক্ষণ’কে বলেন, ‘এই সমস্যা আরো দীর্ঘায়িত হবে। কারণ, তাদের ফেরত নেয়ার জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাস্তবে তেমন কোনো চাপই সৃষ্টি করেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা ইস্যুকে তাদের সর্বোচ্চ গুরুত্বের জায়গায় রাখেনি। তাদের বিবেচনায় আরো অনেক বড় সমস্যা আছে। ফলে তারা এই ইস্যুটিকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছে না। আর করোনার কারণে সব দেশই অর্থনৈতিক চাপে আছে। ফলে মানবিক সহায়তা কমছে। শুরুতে অনেকের আগ্রহ থাকে। এখন তারা দেখছে এই সমস্যা চলতেই থাকবে। তাই কত দিন আর সহায়তা করবে। সমস্যাটি আমাদের ঘাড়ে চেপেছে। তবে আমাদের উচিত হবে ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাঙা রাখা।’

সর্বশেষ নিউজ