২৯, মে, ২০২৪, বুধবার
     

কারিগরি শিক্ষার কারিগরই নেই

Afsana Afroze:

রাষ্ট্র ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষায় বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। কিন্তু শিক্ষকের অভাবে কুড়িগ্রামের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তারা মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষা পাচ্ছেন না। এ ছাড়াও আবাসন এবং বিনোদন সুবিধার অভাবসহ নানাবিধ সংকটে ধুঁকছে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। কুড়িগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, ‘আমাদের ময়দান আছে, সৈনিক, অস্ত্র ও গোলাবারুদ আছে। কিন্তু কমান্ডারের অভাবে প্রশিক্ষণ নিতে পারছি না; লড়াই করার উপযুক্ত হয়ে মাঠে যেতে পারছি না। আমাদের কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার কারিগরই নেই।’

অনেকটা রূপক ভাষায় তারা কথাগুলো বললেও প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব চিত্র এমনই। অবকাঠামো, শিক্ষার্থী ও পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা থাকলেও শুধু শিক্ষকের অভাবে মানসম্পন্ন কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। প্রতিষ্ঠান প্রধানরা বলছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষক চেয়ে বারবার প্রতিবেদন দেওয়া হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। ফলে খণ্ডকালীন শিক্ষক ও সদ্য পাস করা শিক্ষার্থীদের দিয়ে পাঠ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সাতটি টেকনোলজিতে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী প্রকৌশল বিদ্যায় পড়াশোনা করছে। প্রায় দুই একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা নেই। ফলে শহরের বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মেসে থেকে পড়াশোনা করতে হয়। এতে বাড়তি খরচসহ নিরাপত্তা নিয়েও নানা বিড়ম্বনায় পড়েন তারা।

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য মতে, এখানে সাতটি টেকনোলজিতে ১৫২ জন শিক্ষক পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৮ জন। তাদের মধ্যে নন টেকনিক্যাল শিক্ষকই বেশি। আর আর্কিটেকচার টেকনোলজিতে একজন শিক্ষকও নেই। ফলে দায় সারতে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

প্রতিষ্ঠানটির সিভিল টেকনোলজি বিভাগের সপ্তম সেমিস্টার চূড়ান্ত পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থী বর্ষা জানান, ২০১৯ সালে তিনি ভর্তি হন। তখন থেকেই তিনি শিক্ষক সংকট দেখছেন। নতুন শিক্ষক আসবেন আসবেন শুনলেও শেষ পর্যন্ত পাননি।

বর্ষা বলেন, ‘এভাবেই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ হয়ে গেলো। না পেলাম শিক্ষক, না পেলাম হল সুবিধা। আবাসন সুবিধা না থাকায় যাতায়াতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। আমাদের পরের ব্যাচের শিক্ষার্থীরা যেন এই সমস্যাগুলোর সম্মুখীন না হয়।’

‘শিক্ষক সংকটে প্রকৌশল বিদ্যার মতো বিষয়গুলো আমরা ভালো করে শিখতে পারছি না। এখানে শিক্ষার্থীদের বিনোদনের কোনও জায়গা নেই।’ উত্তরসূরিদের জন্য সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের দাবি জানান সপ্তম সেমিস্টার শেষ করা এই শিক্ষার্থী।

ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজির শিক্ষার্থী মাইদুল বলেন, ‘আমি উলিপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্রের দ্বীপচর থেকে পড়তে এসেছি। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানে গেস্ট টিচারদের কাছে ক্লাস করেছি।

তাদের বেশির ভাগই সদ্য পড়াশোনা শেষ করা ছাত্র কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। যাদের অনেকেই ল্যাবের মেশিনারি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন না। ফলে আমরাও ভালো করে শিখতে পারছি না। আমার আগে যারা গেছেন এবং পরে যারা আসছেন তাদেরও এই অবস্থা।’ একই অভিযোগ কম্পিউটার টেকনোলজির শিক্ষার্থী শেখ ফরিদ ও হাসানের।

শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত করেননি ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ড. নুর আলম। তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট রয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১৮ জন শিক্ষক নিয়ে আমরা চলছি। সপ্তাহে প্রতি ব্যাচের প্রায় ৩৫টি ক্লাস থাকে। খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানেন। তারা শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছেন। হয়তো দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’

ল্যাব সুবিধা প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ বলেন, ‘ল্যাবে যথেষ্ট পরিমাণ যন্ত্রাংশ রয়েছে। কিন্তু আবাসিক সুবিধা ও খেলার মাঠ নেই। এসব কারণে শিক্ষার্থীরা বিড়ম্বনায় পড়েন। বিশেষ করে, ছাত্রীদের জন্য আবাসিক সুবিধা থাকাটা জরুরি।’

শিক্ষক সংকটে শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যক্ষ বলেন, ‘আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এমনকি আমি নিজেও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছি।’

শহরের টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের (ভোকেশনাল) চিত্রও অনেকটা একই। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও এই প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষক সংকট চরমে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত চার ট্রেডে এই প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী নয় শতাধিক। কর্মমুখী শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভর্তি হলেও তারা শিক্ষকের অভাবে নিজেদের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। ৬৪ পদের বিপরীতে এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৬ জন

। শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখতে লাইব্রেরিয়ান, স্টোর কিপার, টুলরুম অ্যাটেনডেন্ট এবং ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়ে চলে পাঠদান। শিক্ষক নামের কারিগর ছাড়া শিক্ষার্থীরা কেমন কারিগরি শিক্ষা পাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফার্ম মেশিনারি বিভাগের শিক্ষক প্রকৌশলী মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘সপ্তাহে প্রতিটি শ্রেণির জন্য ১৮টি ক্লাস। শিক্ষক সংকটের কারণে একজন শিক্ষককে সপ্তাহে অন্তত ৫০টি ক্লাস নিতে হয়। এ থেকেই অবস্থা অনুমান করতে পারেন।’

প্রায় ছয় বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মুনজুর হোসেন বলেন, ‘আমাদের নতুন ভবন হয়েছে। ল্যাবের যন্ত্রাংশ পর্যাপ্ত রয়েছে। সংকট শুধু শিক্ষকের। আমাদের যে শিক্ষকরা আছেন তাদের মধ্যে মাত্র ছয় জন টেকনিক্যাল। বাকিরা নন-টেকনিক্যাল। ঘাটতি পূরণে সরকার পিএসসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জেনেছি।’

               

সর্বশেষ নিউজ